টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ভরাডুবির ময়নাতদন্ত

মোট পড়া হয়েছে 105 

টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ভরাডুবির প্রধান ৬টি কারনঃ

১।একটি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট দল হিসাবে কন্ডিশনের সাথে মানিয়ে নেওয়া বেসিক ক্রিকেটেরই  একটি অংশ। কিন্তু বাংলাদেশ ক্রিকেট দল সাধারনত কিছু সিলেক্টেড কন্ডিশন ছাড়া ভালো করতে পারেন না। যখনই উইকেট চিরাচরিত ধারার বাইরে গিয়ে একটু ভিন্নভাবে আচরণ করে তখনই ক্রিকেটাররা আশানুরূপ পারফরম্যান্স করতে পারেন না । এর প্রধান কারন স্পোর্টিং উইকেটে না খেলা। টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ ইউএইতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে এবং সেখানের কন্ডিশন অনেকাটাই বাংলাদেশের সাথে মিল আছে। সেই দিক হিসাব করলে বাংলাদেশের এই বিশ্বকাপে ভালো করার কথা ছিল কিন্তু তা সত্ত্বেও বাংলাদেশ বিশ্বকাপের সুপার টুয়েলভের তিনটা ম্যাচই হেরেছে। 

২। বাংলাদেশে স্পোর্টিং উইকেটে নেই বললেই চলে । দেশের উইকেটগুলো লো স্লো বাউন্স সমৃদ্ধ যেগুলোতে ব্যাটসম্যানদের রান করতে প্রচুর সংগ্রাম করতে হয়। এই উইকেটগুলোতে পাওয়ার হিটিংয়ের প্রত্যাশা করা আর মরুভূমিতে পানির আশা করা একই কথা। এছাড়া আমাদের ক্রিকেটের সংস্কৃতিতে পাওয়ার হিটিংয়ের অভ্যাস নেই। 

৩। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের কর্তা-ব্যক্তিদের ক্রিকেটের মূল কাঠামো নিয়ে কখনই উল্লেখযোগ্য কোন কাজ করতে দেখা যায় না। যুগের সাথে তাল মিলাতে হলে ক্রিকেটের কাঠামোতে যে পরিবর্তনগুলো আনা প্রয়োজন ছিল তার সেগুলো করতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ। অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের ক্রিকেট আজ বড় এক ঝুকির মুখে। অন্যান্য ক্রিকেট বোর্ডের প্রধান যেখানে ক্রিকেট সংস্লিষ্ট ব্যাক্তিদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের প্রধান নাজমুল হাঁসান পাপন , যার ক্রিকেটের সাথে কোন ধরণের যুগসুত্র না থাকা সত্তেও ৯ বছর ধরে একই পদে বহাল আছেন। এটা বলার অপেক্ষা রাখেনা তার অধীনে বাংলাদেশের ক্রিকেটের আশানুরূপ উন্নতি সাধন হয়নি। 

৪। সীমিত ওভারের ম্যাচে ফিল্ডিংয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। একটা ক্যাচ কিংবা একটা ভালো ফিল্ডিং যেকোন সময় ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। ফিল্ডিং গ্রুপ হিসিবে বাংলাদেশ গত ১ বছর দুঃস্বপ্নের মত সময় কাটিয়েছে। এই সময়ে মুড়ি-মুড়কির মত ক্যাচ ফেলেছে বাংলাদেশের ফিল্ডাররা। টি-টুয়েন্ট বিশ্বকাপে বাংলাদেশ বাছাই পর্ব ও সুপার টুয়েলভ মিলিয়ে মোট ১২টি ক্যাচ ফেলেছে ৬ ম্যাচে। যার সবগুলোই ছিল রেগুলেশন ক্যাচ। একটি আর্ন্তজাতিক দল হিসেবে যা মোটেও গ্রহণযোগ্য না। 

৫। অন্যান্য দলগুলো যেখানে বিশ্বকাপের আগে খেলোয়াড়দের দুর্বলতা,শক্তিমত্তা,কন্ডিশন ইত্যাদি নিয়ে কাজ করে  যাতে দলের খেলোয়াড়রা গুরুত্বপূর্ণ সময়ে নিজেদেরকে ভালোভাবে মেলে ধরতে পারেন।কিন্তু বাংলাদেশ দলের ক্ষেত্রে এই ধরণের কোন তৎপরতা দেখা যায় না। বাংলাদেশের প্রাক্তন অধিনায়ক মোহাম্মদ আশরাফুল মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ দল থেকে স্কটল্যান্ড ও নামিবিয়া বিশ্বকাপের জন্য বেশি প্রস্তুতি নিয়েছে। 

উদাহারনসরূপ টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের আগে মিরপুরের স্লো উইকেটে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজ জিতল। আমাদের ক্রিকেটের কর্তাব্যাক্তিরা কি জানেন না যে আইসিসি বরাবরই স্পোর্টিং উইকেটে বিশ্বকাপের আয়োজন করে। সেই দিক থেকে বাংলাদেশেকে অবশ্যই বিশ্বকাপের আগে স্পোর্টিং উইকেটে বেশি বেশি ম্যাচ খেলা দরকার ছিল । এটা থেকে পরিষ্কার ম্যানেজম্যান্টের দল নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী কোন পরিকল্পনা নেই। 

৬। বিদেশী কোচের সাথে কাজ করার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ভাষাগত পার্থক্য। এই ভাষাগত তফাৎ এর জন্য ক্রিকেটাররা নিজের সমস্যার কথা মন খুলে কোচদের কাছে ব্যাক্ত করতে পারেন না। এই সমস্যাগুলোকে কাটিয়ে ওঠার জন্য ভারত, নিউজিল্যান্ড অস্ট্রেলিয়া সহ প্রায় সবগুলো টেস্টপ্লেয়িং দল দেশি কোচিং প্যানেল নিয়োগ দিয়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশই একমাত্র ভিন্ন পথে হাটছে। তারা একগাদা বিদেশী কোচের মেলা বসিয়েছেন । যাদের প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশের ক্রিকেট সম্পর্কে খুবই সীমিত জ্ঞান। 

২০১৫ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সাথে হেরে ইংল্যান্ডের বোধদয় কিন্তু আমরা কোন জায়গায়? 

২০১৫ বিশ্বকাপের কোয়টার ফাইনালে বাংলাদেশের সাথে হেরে ইংল্যান্ড তাদের ক্রিকেটের খোলস পালটে ফেলেছে। যার ফলসরুপ তারা ২০১৯ ক্রিকেট বিশ্বকাপে তারা প্রথম বারের মত চ্যাম্পিয়ন হয়। তারা ২০১৫ সালে বাংলাশের সাথে হারের পর নিজেদের চেহারা আয়নায় দেখছিল বল আজ দল হিসিবে অনেক উন্নতি করছে। সেই জায়গা থেকে বাংলাদেশের কথা চিন্তা করলে যদি এটা বলা যায় টাইগাররা পিছন দিকে হাটছে তাহলে ভুল বলা হবেনা। 

আমাদের ক্রিকেটের অর্জনের খাতায় বিগত ৬ বছরে তেমন কোন উল্লেখযোগ্য সফলতার পালক নেই। সোজা ভাষায় বলতে গেলে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল তাদের ক্রিকেটকে এখনও মিরপুরের বাইরে নিয়ে যেতে পারিনি। 

ঘরের মাটিতে সিরিজ জয়ের মিথ্যা আত্নবিশ্বাস 

বিশ্বকাপে ঘরের মাটিতে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল হাওয়ায় গা ভাসিয়ে বেড়িয়েছে।  এই মিথ্যা আত্নবিশ্বাস বিশ্বকাপে কাজে দিবে বলা হলেও মুল পর্বে এর উলটা প্রতিচ্ছবি দেখা গেল যেখানে বাংলাদেশ সহযোগি দেশগুলোর সাথেও জেতার জন্য রীতিমত সংগ্রাম করতে হয়েছে। এর মানে দুর্বলতম দলগুলোও বাংলাদেশকে বিপদে ফেলে দিচ্ছে। 

বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড ও বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি ম্যাচ চলার সময় ইংল্যান্ড ধারাভাষ্যকার মাইকেল আথারটন বলেন দেয়ার ইজ হিউজ ডিফারেন্স বিটুইন বাংলাদেশ এন্ড ইংল্যান্ড টিম। আসলেই তাই ইংল্যান্ডের সাথে বাংলাদেশের খেলা দেখে মনে হচ্ছিল তারা মাঠে খেলার আগেই তারা হেরে বসে ছিল। মাঠে নেমেছিল স্রেফ নিয়মরক্ষা করার জন্য। নিজেদের তৃতীয় ম্যাচে ওয়েস্টিন্ডিজের বিপক্ষে কিছুটা ভাল খেললেও শেষ পর্যন্ত ব্যাটিং ব্যর্থতায় ৪ রানে হেরে যায় বাংলাদেশ। 

যুদ্ধ বিধস্ত দল আফগানিস্তানের বিশ্ব ক্রিকেটে উত্থানের খুব বেশি দিন হয়নি। তাদের অর্থনৈতিক অবস্থাও বাংলাদেশ থেকে অনেক খারাপ। কিন্তু তারাও টি-টুয়েন্টি ক্রিকেটে আমাদের থেকে অনেক ভালো ব্র‍্যান্ডের ক্রিকেট খেলছে। আফগানিস্থান তাদের সুপার টুয়েলভের যাত্রা শুরু প্রথম ম্যাচে স্কটল্যান্ডকে উড়িয়ে দিয়ে। নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে ভারত ও নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে উড়তে থাকা পাকিস্তানকেও প্রায় মাটিতে নামিয়ে দিয়েছিল। 

 

বোর্ডের অপসংস্কৃতিতে জিম্মি বাংলাদেশ ক্রিকেট

নাজমুল হাঁসান পাপন বলছেন বাংলাদেশের ক্রিকেট বোর্ডের ৯০০ কোটি টাকা ফিক্সড ডিপোজিট আছে। এই অলস টাকা জমিয়ে রেখে কি লাভ যদি ক্রিকেটের উন্নয়নের জন্য ব্যবহার না করা হয়।

কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট ক্রিকেট বা অন্য যেকোন পেশাদারী ক্ষেত্রে একটি খুবই কমন প্র্যাক্টিস। নাজমুল হাঁসান পাপন বাংলাদেশের বোর্ড প্রেসিডেন্ট এই টার্মের থোড়াই কেয়ার করেন তিনি বাংলাদেশ ক্রিকেটের সব্যসাচী পুরুষ যিনি এক হাতে সব করে যাচ্ছেন। 

অথচ ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের প্রেসিডেন্ট সৌরভ গাঙ্গুংলী সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত এড়াতেই সম্প্রতি মোহনবাগানের ডিরেক্টর পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। এটাই হওয়া উচিৎ নয় কি ? একজনের দ্বারা কিভাবে এত দায়িত্ব পালন করা সম্ভব। 

আরেকটি উদাহরন দেয়া যাক সম্প্রতি পাকিস্তানের জনপ্রিয় ধারাভাষ্যকার রমিজ রাজা বোর্ড প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ধারাভাষ্য থেকে সাময়িকভাবে বিরতি নিয়ে ক্রিকেটের উন্নয়নে কাজ করেছেন। যার ফলসরূপ পাকিস্তান এবারের বিশ্বকাপে দল হিসিবে খুবই ভালো করছে। কিন্তু রমিজ রাজাই যদি বিভিন্ন পেশায় ব্যস্ত থাকতেন তাহলে ক্রিকেট নিয়ে যথেষ্ট কাজ করতে পারতেন? অবশ্যই না। 

তিনি ক্রিকেটারদেরকে নিয়ে সমালোচনা করার জন্য বরাবরই মিডিয়াকে বেছে নেন। অন্য কোন দেশের ক্রিকেট বোর্ডের প্রধান এইভাবে সবার সামনে ক্রিকেটারদের নিয়ে সমালোচনা করেন বলে মনে হয়না। টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ স্কটল্যান্ডের সাথে ম্যাচ হারার পর তিনি একই ধরণের কাজ করেছেন যা ক্রিকেটারদের উপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে আর মাঠের মধ্যে এর প্রতিফলন দেখেছি। 

কিন্তু বাংলাদেশ দল যদি ভালো করে তখন তিনি সবার আগে চলে আসেন ক্রেডিট নিতে আর ব্যর্থতার সব দায় ক্রিকেটারদের ।বছরের পর বছর ক্রিকেট দলের কর্তা-ব্যাক্তিরা দলের উন্নতির মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে আসছেন। বাংলাদেশ ক্রিকেট দল বড় আসরে খারাপ করলে অধিনায়ক ও ক্রিকেটারদের বলির পাঠা বানানো হয়। কিন্তু তারা নিজেরা ঠিকই বছরের পর বছর বাংলাদেশ ক্রিকেটের মসনদে বসে আছেন । 

সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের দর্শকরা ক্রিকেট দলেকে যেভাবে সমর্থন করে এর ২০ ভাগের একভাগও ক্রিকেটাররা মাঠে প্রতিফলিত করতে পারছেনা । 

এর দায় যতটা ক্রিকেটারদের এর চেয়ে বেশি ক্রিকেট বোর্ডের কর্তাব্যাক্তিদের। তারা ক্রিকেটকে প্রহসনের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছেন। বাংলাদেশের ক্রিকেটের স্বার্থে সময় এসেছে ক্রিকেট বোর্ডকে ঢেলে সাজানোর। ক্রিকেট বোর্ড নিয়ে যে সার্কাস চলছে সময় এসেছে এর ইতি টানার। 

 

 

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *